আপনার নামের ভুল জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)–এ থাকলে ভবিষ্যতে নানা জটিলতার কারণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পাসপোর্ট, ভিসা কিংবা চাকরির আবেদন দাখিলের সময় এনআইডির নামটি অন্য কোনো সরকারি কাগজের (যেমন জন্ম সনদ বা এসএসসি সার্টিফিকেট) সঙ্গে মিলবে না, ফলে আবেদন বাতিল হতে পারে বা সময় নষ্ট হতে পারে।
২০১৬ সালে চিপযুক্ত স্মার্ট এনআইডি চালু হওয়ার পর ২০২০ সাল থেকে অনলাইনে সংশোধন সেবা চালু হয়েছে। তাই ভুল তথ্য দেখলেই দ্রুত সংশোধন করে নেওয়াই নিরাপদ। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (NID Wing) এখন অনলাইনের মাধ্যমে NID কার্ড সংশোধনের সুযোগ দিচ্ছে।
পরবর্তী অংশে ধাপে ধাপে দেখানো হলো কীভাবে ২০২৬ সালের নিয়মে আপনার NID কার্ডের ভুল নাম সংশোধন করবেন।
নাম সংশোধনের ধাপসমূহ
নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে সহজেই অনলাইনে নাম সংশোধনের আবেদন করতে পারেন:
- রেজিস্ট্রেশন ও লগইন: প্রথমে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের NID ওয়েবসাইট (services.nidw.gov.bd) এ ঢুকুন। এনআইডি নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন এবং মোবাইলে আসা ওটিপি বা ফেস ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে লগইন করুন। এছাড়া, পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে হওয়ায় আর পুরনো কোনো ফরম পূরণ করার প্রয়োজন নেই।
- প্রোফাইল এডিট করে নাম সংশোধন: লগইন করার পর ‘প্রোফাইল’ সেকশনে যান এবং ‘এডিট’ (Edit) বাটনে ক্লিক করুন। আপনার ভুল নাম সঠিক বানানে (বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায়) লিখে পরিবর্তন করুন। নামের সঠিক বানান অবশ্যই আপনার এসএসসি/এইচএসসি বা জন্মনিবন্ধন সনদে থাকা অনুযায়ী হোক।
- ফি পরিশোধ: প্রয়োজনীয় তথ্য পরিবর্তনের পর সাধারণ বা জরুরি হিসেব অনুযায়ী নির্ধারিত ফি পরিশোধ করুন। বাংলাদেশে NID সংশোধন ফি এখন অনলাইনে দিতে হয়; বিকাশ, রকেট, নগদ, সোনালী ব্যাংক ই-ট্রান্সফার ইত্যাদি মাধ্যমে অর্থ প্রদানের সুবিধা রয়েছে।
- কাগজপত্র আপলোড: ফি পরিশোধ করার পর সংশোধনের সহায়ক দস্তাবেজগুলো স্ক্যান করে আপলোড করুন। যেমন, আপনার এসএসসি বা অন্যান্য শিক্ষাগত সনদপত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ, অথবা পাসপোর্টের স্ক্যান করা কপি। তথ্য যেন পরিষ্কার হয়, এ ক্ষেত্রে মোবাইল ক্যামেরার ঝাপসা ছবি নয়, স্ক্যান করা পিডিএফ বা পরিষ্কার ছবি ব্যবহার করুন।
- আবেদন জমা ও রসিদ সংরক্ষণ: সব তথ্য ঠিকমতো প্রবেশ করালে ‘সাবমিট’ বাটনে ক্লিক করে আবেদন জমা দিন। সাবমিশনের পর একটি প্রাপ্তির রশিদ (সাবমিশন রসিদ) দেখাবে, সেটি ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করুন। এই রশিদটি ভবিষ্যতে আবেদন স্ট্যাটাস যাচাইয়ে প্রয়োজন হবে।
প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর সিস্টেম আপনাকে ইমেইল বা এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেবে যে আপনার আবেদন গ্রহণ হয়েছে। সংশোধন অনুমোদিত হলে ভোটার এলাকা থেকে নতুন সংশোধিত এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করতে বলা হবে।
NID সংশোধনী বাতিল হলে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।
নাম সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: আপনার এনআইডি কার্ডে নাম সংশোধনের জন্য সাধারণত নিম্নলিখিত সরকারি সনদপত্র জমা দিতে বলা হয়:
- এসএসসি/এইচএসসি (বা সমমান) পরীক্ষার সনদপত্র
- জন্মনিবন্ধন সনদ
- পাসপোর্ট (যদি থাকে)
- নাগরিকত্ব সনদপত্র
উপরের তথ্যে থাকা নাম অবশ্যই আপনার জেনুইন, সঠিক নামের সাথে মিলে হতে হবে। যেমন, এসএসসি সনদে “সোহেল রহমান” লেখা থাকলে আবেদনেও একই হিসাবে নাম দিন।
যদি আপনার কাছে এসএসসি বা এসএসএসসি সনদ না থাকে, তাহলে জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট বা অন্য কোনো সরকার অনুমোদিত পরিচয়পত্র দেখে আবেদন করতে পারেন।
সহজেই স্মার্ট NID কার্ড স্ট্যাটাস চেক করুন।
ফি ও সময়সীমা
নাম সংশোধনের জন্য বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন যে ফি নির্ধারণ করেছে তা সাধারণত নিম্নরূপ:
- প্রথমবার সংশোধন (সাধারণ প্রক্রিয়া): ২৩০ টাকা (ভ্যাট ছাড়া)
- জরুরি সংশোধন (দ্রুত প্রক্রিয়া): ৩৪৫ টাকা (ভ্যাট ছাড়া)
- পুনরায়/জটিল সংশোধন: প্রথমবারের চেয়ে বেশি (দ্বিতীয়বার ৩৪৫ টাকা, তৃতীয়বার ৫৭৫ টাকা ভ্যাট ছাড়া)
উল্লেখ্য, এই ফিগুলোর ওপর ১৫% ভ্যাট যোগ হবে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন ফি হিসেবে ২৩০ টাকার সঙ্গে ভ্যাট যোগ করে প্রদান করতে হয়। ফি অনলাইনে মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে জমা দিতে হবে, নগদভাবে নেওয়া হয় না।
সাধারণত অনলাইনে আবেদন করার পর ১৫-৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে আপনার আবেদন নিষ্পত্তি হয়ে যায়। সহজ ক্ষেত্রে ৭-১০ দিনেও কাজ হতে পারে। তবে তথ্য পরিবর্তনের স্তর ও জেলা নির্বাচন অফিসের কার্যবহুলতার ওপর সময় নির্ভর করে। জরুরি প্রক্রিয়া করলে দ্রুত (সাধারণত ১ মাসের মধ্যে) কাজ শেষ হয়।
হারানো বা নষ্ট হওয়া NID উত্তলোনের সহজ ও কার্যকরী উপায় জেনে নিন।
সতর্কতা ও পরামর্শ
নাম সংশোধনের আবেদন করার সময় নিচের বিষয়গুলো মাথায় রাখুন:
- তথ্য শতভাগ মিল রাখুন: আবেদনপত্রে যে নামটি দিয়েছেন, সেটি আপনার সরকারি সনদে থাকা নামের সঙ্গে একেবারে মিল থাকা উচিত। প্রতিবার আবেদন জমা দেওয়ার আগে পুরো নাম এবং বানান ভালোভাবে যাচাই করে নিন।
- পরিষ্কার কপি ব্যবহার করুন: আপলোড করা দস্তাবেজগুলো স্পষ্টভাবে স্ক্যান করা এবং পরিষ্কার ছবি হওয়া আবশ্যক। মোবাইল ক্যামেরায় ঝাপসা ছবি জমা দিলে আবেদন বাতিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
- যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখান: NID–এ নামের পরিবর্তনের কারণ পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করুন। সাধারণ ভুল শুধরে দেওয়ার ক্ষেত্রে কথা বলার প্রয়োজন কম, তবে অতিরিক্ত কিছু পরিবর্তন হলে আবেদনপত্রে কারণ উল্লেখ করলে সহায়তা করে।
- নিয়মিত স্ট্যাটাস চেক করুন: আবেদন জমা দেওয়ার পর কিছু দিন পর নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে লগইন করে ‘স্ট্যাটাস’ বিভাগে আপনার আপডেট চেক করতে পারেন।
এই সমস্ত পরামর্শ মেনে চললে আপনার আবেদন সহজে অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
নাম সংশোধন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা আপনার বাকি সরকারি নথিপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখে। সঠিক কাগজপত্র এবং অনলাইনে প্রদত্ত ফি দিয়ে দ্রুত আবেদন করলে আপনার ভুল নাম সহজেই সংশোধন হয়ে যাবে।
২০২৬ সালের নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল করেছে, তাই ঘরে বসেই আবেদন করে নাম ঠিক করে নেওয়া সম্ভব। ভুল নাম থাকলে জীবন থেকে জরুরি সুযোগ-সুবিধায় বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই এখনই বিষয়টি ঠিক করে ভবিষ্যতের ঝামেলা এড়ান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
এনআইডি কার্ডে নাম সংশোধনের জন্য আবেদন ফরম কোথায় পাব?
এখন আর আলাদা কোনো কাগজপত্র ফরমের প্রয়োজন নেই। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে লগইন করে অনলাইনে আবেদন সম্পূর্ণ করতে হবে। (প্রয়োজন হলে উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে “ফরম-২” সংগ্রহ করে অফলাইনে আবেদন করা যায়।)
নাম সংশোধনের সরকারি ফি কত?
সাধারণ (প্রথমবার) ফি ২৩০ টাকা (ভ্যাট ছাড়া)। জরুরি প্রক্রিয়ায় ফি ৩৪৫ টাকা (ভ্যাট ছাড়া)। দ্বিতীয়বার বা জটিল সংশোধনে ফি আরও বাড়তে পারে।
নাম সংশোধনের জন্য কি কি দলিল প্রয়োজন?
সাধারণত আপনার এসএসসি/এইচএসসি সনদপত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট বা নাগরিকত্ব সনদ জমা দিতে হয়। এই দস্তাবেজগুলোতে থাকা নামের সঙ্গে আপনার আবেদনপত্রের নাম মিলে থাকতে হবে।
নাম সংশোধনের আবেদন করার পর কতদিনে কাজ শেষ হবে?
সাধারণ আবেদন করলে ১৫-৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে কাজ শেষ হয়। সহজ ক্ষেত্রে ৭-১০ দিনের মধ্যেও হতে পারে। জরুরি আবেদন করলে দ্রুত (সাধারণত ১ মাসের মধ্যে) সংশোধন হয়ে যায়।
সংশোধনের আবেদন স্ট্যাটাস কিভাবে জানতে পারবো?
ভোটার আইডি ওয়েবসাইটে লগইন করে ‘Dashboard’ > ‘Status’ অপশন থেকে আপনার আবেদন স্ট্যাটাস দেখতে পারবেন। এছাড়া ১০৫ নম্বরে কল করেও অবস্থা জানতে পারেন।


