বিদেশে পার্টটাইম চাকরি করে কি পুরো খরচ চালানো যায়?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: অনেক দেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা বৈধভাবে পার্টটাইম কাজ করতে পারেন। এই আয় দিয়ে বাসাভাড়া, খাবার বা যাতায়াতের কিছু খরচ মেটানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু শুধু চাকরির আয়ের ওপর নির্ভর করে টিউশন ফি ও সব জীবনযাত্রার খরচ চালানোর পরিকল্পনা ঝুঁকিপূর্ণ। কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, ভিসার কাজের সময়সীমা আছে এবং পরীক্ষার সময় কাজ কমাতে হতে পারে।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগে তাই দুটি আলাদা হিসাব করুন: কাজ না পেলেও কতদিন চলতে পারবেন এবং কাজ পেলে বাস্তবে কত টাকা হাতে থাকবে।
কোন দেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা কত ঘণ্টা কাজ করতে পারেন?
নিচের নিয়মগুলো সাধারণ শিক্ষার্থী ভিসার জন্য। কোর্সের ধরন, ভিসার শর্ত এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যতিক্রম থাকতে পারে।
- কানাডা: যোগ্য শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস চলাকালে ক্যাম্পাসের বাইরে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। নির্ধারিত একাডেমিক ছুটিতে ভিন্ন নিয়ম প্রযোজ্য। IRCC-এর নিয়ম দেখুন।
- যুক্তরাজ্য: অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন ডিগ্রি-স্তরের কোর্সে সাধারণত টার্ম চলাকালে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা; ডিগ্রির নিচের কিছু কোর্সে ১০ ঘণ্টা বা কাজের অনুমতি নাও থাকতে পারে। UK Student Rules দেখুন।
- অস্ট্রেলিয়া: সাধারণ Student visa (subclass 500)-তে কোর্স চলাকালে প্রতি দুই সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা। Research master’s ও doctoral শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যতিক্রম রয়েছে। Home Affairs দেখুন।
- জার্মানি: সাধারণ non-EU শিক্ষার্থীরা বছরে ১৪০ পূর্ণ দিন বা ২৮০ অর্ধদিন কাজের সুযোগ পেতে পারেন; বিকল্পভাবে working-student ব্যবস্থায় সপ্তাহে ২০ ঘণ্টার নিয়ম প্রাসঙ্গিক হতে পারে। চাকরির ধরন ও residence permit যাচাই জরুরি। Make it in Germany দেখুন।
- যুক্তরাষ্ট্র: F-1 শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাস চলাকালে অনুমোদিত on-campus কাজ সাধারণত সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত। Off-campus কাজের জন্য আলাদা যোগ্যতা ও অনুমোদন প্রয়োজন; সাধারণ চাকরির অনুমতি ধরে নেওয়া যাবে না। Study in the States দেখুন।
সতর্কতা: ‘২০ ঘণ্টা কাজ করা যায়’ মানেই ২০ ঘণ্টার চাকরি পাওয়া যাবে, এমন নয়। অনুমোদিত কাজের ধরন ও ঘণ্টা ভিসার কাগজে মিলিয়ে নিন।
পার্টটাইম আয়ের বাস্তব হিসাব: একটি উদাহরণ
ধরা যাক, কোনো দেশে আপনি বৈধভাবে সপ্তাহে ১৬ ঘণ্টা কাজ করছেন এবং ঘণ্টায় ১২ ইউনিট স্থানীয় মুদ্রা পাচ্ছেন। তাহলে আনুমানিক মাসিক মোট আয় = ১৬ × ১২ × ৪.৩৩ = ৮৩১.৩৬ ইউনিট। এটি কেবল হিসাব বোঝানোর উদাহরণ, কোনো দেশের নিশ্চিত মজুরি নয়।
এখান থেকে কর, সামাজিক বীমা বা অন্যান্য কর্তন হতে পারে। যাতায়াত, কাজের পোশাক এবং খাবারের খরচও থাকতে পারে। এক মাসে ১৬ ঘণ্টার কাজ পেলেও পরের মাসে শিফট কমে যেতে পারে। তাই আয়কে বাজেটের অতিরিক্ত সহায়তা হিসেবে ধরুন, নিশ্চিত ফান্ডিং হিসেবে নয়।
উদাহরণস্বরূপ, মাসিক বাসাভাড়া ও অন্যান্য খরচ ১,১০০ ইউনিট হলে ৮৩১ ইউনিট মোট আয় দিয়ে সব খরচ মেটানো সম্ভব নয়। টিউশন ফি তখনও আলাদা থাকবে। বিদেশে যাওয়ার মোট বাজেট বুঝতে শিক্ষা ঋণ ও বিকল্প ফান্ডিংয়ের গাইড পড়তে পারেন।
কী ধরনের Part Time Jobs for International Students পাওয়া যায়?
শিক্ষার্থীরা সাধারণত ক্যাম্পাস লাইব্রেরি, ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট, রিটেইল শপ, সুপারমার্কেট, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অফিস, টিউটরিং বা research assistant পদে কাজ খোঁজেন। তবে প্রতিটি কাজের জন্য স্থানীয় ভাষা, অভিজ্ঞতা বা নির্দিষ্ট অনুমতি লাগতে পারে।
ক্যাম্পাসের কাজ: ক্লাসের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে শিফট পাওয়া সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু পদ সীমিত। ক্যাফে ও রিটেইল: সন্ধ্যা বা সপ্তাহান্তের শিফট থাকতে পারে, তবে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। টিউটরিং বা গবেষণা: বিষয়ের দক্ষতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। ডেলিভারি বা ফ্রিল্যান্সিং: সব দেশে student visa-তে self-employment অনুমোদিত নয়। বিশেষ করে UK Student visa-তে সাধারণত self-employment নিষিদ্ধ। কাজ শুরুর আগে নিয়ম যাচাই করুন।
বিদেশে গিয়ে চাকরি খোঁজার সাতটি বাস্তব ধাপ
- প্রথমে ভিসার কাজের শর্ত পড়ুন। কাজ শুরুর অনুমতি, ঘণ্টা ও নিষিদ্ধ কাজগুলো লিখে রাখুন।
- ক্যাম্পাস career service-এ যোগাযোগ করুন। Student job board, career fair এবং campus employer-এর তথ্য নিন।
- এক পাতার স্থানীয় স্টাইলের CV তৈরি করুন। কাজের সঙ্গে মিলিয়ে customer service, language, software ও availability উল্লেখ করুন। Academic application-এর CV থেকে চাকরির CV আলাদা হতে পারে। Academic CV তৈরির গাইড দেখুন।
- ক্লাসের সময়ের সঙ্গে শিফট মিলিয়ে আবেদন করুন। নিয়োগকর্তাকে শুরুতেই কাজের বৈধ সীমা জানান।
- বিশ্বস্ত চাকরির উৎস ব্যবহার করুন। বিশ্ববিদ্যালয়, পরিচিত নিয়োগকর্তা ও সরকারি employment portal-কে অগ্রাধিকার দিন।
- লিখিত চুক্তি ও payslip রাখুন। মজুরি, ঘণ্টা, কর্তন এবং কাজের দায়িত্ব বুঝে সই করুন।
- প্রতি সপ্তাহে কাজের ঘণ্টা লিখে রাখুন। একাধিক চাকরি থাকলেও প্রযোজ্য মোট সীমা অতিক্রম করবেন না।
বিদেশে যাওয়ার আগে কত টাকা হাতে রাখা উচিত?
কমপক্ষে প্রথম কয়েক মাসের বাসা, খাবার, পরিবহন, স্বাস্থ্যবিমা, জরুরি খরচ এবং পরবর্তী টিউশন কিস্তির পরিকল্পনা থাকা দরকার। নির্দিষ্ট অঙ্ক দেশ, শহর, বিশ্ববিদ্যালয় ও ভিসার financial requirement-এর ওপর নির্ভর করে। শুধু সম্ভাব্য চাকরির আয়ের হিসাব দেখিয়ে ভিসার প্রয়োজনীয় ফান্ড পূরণ হয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
আপনি যে দেশে যাচ্ছেন, সেখানে প্রথম মাসে বাসার deposit, bedding, SIM, transport pass ও অন্যান্য সেটআপ খরচও আসতে পারে। ভর্তি সেশন ও যাত্রার সময় ঠিক করতে Fall, Spring ও Winter intake গাইড কাজে লাগবে।
কাজ করতে গিয়ে যেসব ভুল এড়াবেন
ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই কাজ শুরু করা, অনুমোদিত সময়ের বেশি কাজ করা, নগদ বেতনের নামে কোনো রেকর্ড না রাখা, ভিসায় নিষিদ্ধ freelance বা self-employed কাজ করা এবং পরীক্ষার সময় অতিরিক্ত শিফট নেওয়া বড় ঝুঁকি।
আরেকটি সমস্যা হলো চাকরির আশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের attendance বা academic progress অবহেলা করা। কিছু দেশে এর ফলে student status ও ভবিষ্যৎ visa application ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভিসা নিয়ে জটিলতা হলে Student Visa Rejection গাইড থেকে প্রত্যাখ্যানের পর করণীয় সম্পর্কে ধারণা পাবেন।
কেউ চাকরি দেওয়ার নামে আগাম বড় অঙ্কের টাকা, পাসপোর্ট জমা বা অস্বাভাবিক personal information চাইলে সতর্ক থাকুন। সরকারি labour rights ও university international office-এর সাহায্য নিন।
FAQ: শিক্ষার্থীদের সাধারণ প্রশ্ন
১. বিদেশে গিয়ে প্রথম মাসেই পার্টটাইম চাকরি পাওয়া যায়?
পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু নিশ্চিত নয়। স্থানীয় ভাষা, শহরের চাকরির বাজার, অভিজ্ঞতা ও একাডেমিক সময়সূচির ওপর নির্ভর করে।
২. পার্টটাইম চাকরি করে পুরো টিউশন ফি দেওয়া সম্ভব?
কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে আয়ের বড় অংশ সঞ্চয় করা গেলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য পুরো টিউশন ও থাকা-খাওয়া শুধু পার্টটাইম আয়ে চালানোর পরিকল্পনা নিরাপদ নয়।
৩. কানাডায় এখন সপ্তাহে ২০ নাকি ২৪ ঘণ্টা কাজ করা যায়?
যোগ্য শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত সেমিস্টারে off-campus কাজের বর্তমান সাধারণ সীমা ২৪ ঘণ্টা। সব যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হবে।
৪. UK-তে Student visa নিয়ে Uber বা freelance কাজ করা যাবে?
সাধারণত self-employment অনুমোদিত নয়। নির্দিষ্ট কাজের আইনগত শ্রেণি যাচাই না করে শুরু করবেন না।
৫. অস্ট্রেলিয়ায় ৪৮ ঘণ্টা কি প্রতি সপ্তাহে?
না। সাধারণ নিয়মটি প্রতি fortnight বা দুই সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা, সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা নয়।
৬. USA-তে F-1 নিয়ে যেকোনো রেস্টুরেন্টে কাজ করা যায়?
না। সাধারণ off-campus employment অনুমোদিত নয়; নির্দিষ্ট authorization প্রয়োজন। On-campus কাজের নিয়ম আলাদা।
৭. IELTS ভালো হলে কি চাকরি নিশ্চিত?
না। ইংরেজি দক্ষতা সহায়ক হলেও কাজের অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ দক্ষতা, সময় ও স্থানীয় চাকরির চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ।
৮. স্কলারশিপ পেলে কি পার্টটাইম কাজ করা যায়?
ভিসা ও স্কলারশিপ উভয়ের শর্ত দেখতে হবে। কিছু funding programme-এ অতিরিক্ত কাজের সীমা বা অনুমোদনের শর্ত থাকতে পারে।
৯. ক্যাম্পাসে কাজের জন্য আলাদা আবেদন লাগে?
সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের career portal বা সংশ্লিষ্ট বিভাগে আবেদন করতে হয়। সুযোগ ও যোগ্যতা বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে আলাদা।
১০. নগদ বেতনে কাজ করলে কি work-hour limit মানতে হবে?
হ্যাঁ। বেতন নগদ বা ব্যাংকে যেভাবেই আসুক, প্রযোজ্য ভিসার কাজের সীমা ও শ্রম আইন মানতে হবে।
১১. একসঙ্গে দুটি পার্টটাইম চাকরি করা যাবে?
অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব, তবে মোট ঘণ্টা, অনুমোদিত কাজের ধরন ও নিয়োগের শর্ত মানতে হবে।
১২. কাজ না পেলে কী করবেন?
জরুরি বাজেট ব্যবহার করুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের financial aid ও career service-এর সঙ্গে কথা বলুন এবং নিয়মিত বৈধ চাকরিতে আবেদন করুন। অননুমোদিত কাজ করে ভিসার ঝুঁকি নেবেন না।


