বিসিএসের জন্য বই কিনতে গিয়ে সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো একই বিষয়ের তিন-চারটি গাইড সংগ্রহ করা, কিন্তু কোনোটিই শেষ না করা। শুরুতে দরকার পিএসসির সিলেবাস, বিগত প্রশ্ন, দুর্বল বিষয়গুলোর জন্য নির্ভরযোগ্য বই এবং নিয়মিত অনুশীলনের পরিকল্পনা। এই গাইডে বিসিএস প্রস্তুতির বই কীভাবে বাছবেন, কোন বিষয়ে কী পড়বেন এবং সীমিত সময়ে কীভাবে রিভিশন দেবেন, তা সাজানো হয়েছে।
বিসিএসের জন্য শুরুতে কোন বইগুলো লাগবে?
প্রথম সপ্তাহে পুরো সেট কেনার প্রয়োজন নেই। শুরু করুন চার ধরনের উপকরণ দিয়ে: সর্বশেষ প্রযোজ্য BPSC সিলেবাস, ব্যাখ্যাসহ বিগত বিসিএস প্রশ্নব্যাংক, বাংলা-ইংরেজি-গণিতের মৌলিক বই এবং একটি হালনাগাদ সাধারণ জ্ঞান উৎস। যেসব বিষয়ে ভিত্তি দুর্বল, শুধু সেগুলোর জন্য আলাদা গাইড নিন।
পিএসসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সংশ্লিষ্ট বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি ও সিলেবাস আগে দেখুন। পরীক্ষাভেদে নম্বর বণ্টন বা বিষয়বস্তু বদলাতে পারে। পুরোনো বইয়ে দেওয়া নম্বর বণ্টনকে নতুন পরীক্ষার নিয়ম ধরে পড়বেন না। বিস্তারিত বুঝতে BanglaGeek-এর বিসিএস সিলেবাস ও নম্বর বণ্টন গাইডটি পড়তে পারেন।
বিষয়ভিত্তিক বিসিএস প্রস্তুতির বইয়ের তালিকা
নিচের নামগুলো বাজারে প্রচলিত বিকল্প, বাধ্যতামূলক বা পিএসসি-অনুমোদিত বই নয়। একটি বিষয়ের জন্য একাধিক প্রকাশনীর সব বই কেনার বদলে দোকানে সূচিপত্র, ব্যাখ্যা, ভুল সংশোধনী ও সংস্করণের তারিখ মিলিয়ে একটি বেছে নিন।
| বিষয় | শুরু করার উপকরণ | কীভাবে পড়বেন |
|---|---|---|
| বাংলা ভাষা ও সাহিত্য | নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ; সৌমিত্র শেখরের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা অথবা একটি বিষয়ভিত্তিক বিসিএস গাইড | ব্যাকরণে নিয়ম ও উদাহরণ; সাহিত্যে যুগ, লেখক, গ্রন্থ ও বিগত প্রশ্ন |
| English Language & Literature | একটি নির্ভরযোগ্য grammar reference (যেমন Wren & Martin); একটি BCS English guide | প্রতিদিন grammar, vocabulary, sentence correction ও literature MCQ |
| গাণিতিক যুক্তি | ষষ্ঠ-দশম শ্রেণির গণিতের প্রাসঙ্গিক অধ্যায়; একটি সমাধানসহ চাকরির গণিত বই | সূত্র মুখস্থের আগে অঙ্ক বোঝা; প্রতিদিন সময় ধরে সমস্যা সমাধান |
| মানসিক দক্ষতা | ব্যাখ্যাসহ mental ability question bank | যুক্তি, ধারা, স্থানিক দক্ষতা ও বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নের নিয়মিত অনুশীলন |
| বাংলাদেশ বিষয়াবলি | বাংলাদেশের ইতিহাস, সংবিধান ও অর্থনীতির নির্ভরযোগ্য পাঠ্য/রেফারেন্স; একটি হালনাগাদ গাইড | তথ্যের উৎস যাচাই; ইতিহাস ও সাংবিধানিক বিষয় আলাদা নোট |
| আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি | একটি সাম্প্রতিক international affairs guide এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদ উৎস | সংস্থা, ভূগোল, সম্পর্ক ও সাম্প্রতিক ঘটনাকে আলাদা করুন |
| সাধারণ বিজ্ঞান | নবম-দশম শ্রেণির সাধারণ বিজ্ঞান এবং সিলেবাসমাফিক প্রশ্নব্যাংক | ধারণা বুঝে চিত্র, সূত্র ও ব্যবহারভিত্তিক প্রশ্ন সমাধান |
| কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি | প্রাসঙ্গিক ICT পাঠ্যবই ও হালনাগাদ MCQ guide | হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, নেটওয়ার্ক ও সাইবার নিরাপত্তার মৌলিক ধারণা |
| ভূগোল, পরিবেশ ও দুর্যোগ | বাংলাদেশ ও বিশ্ব ভূগোলের পাঠ্যবই, মানচিত্র এবং বিষয়ভিত্তিক নোট | মানচিত্রে অবস্থান চিহ্নিত করে অনুশীলন |
| নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন | পিএসসির সিলেবাসভিত্তিক সংক্ষিপ্ত রেফারেন্স | ধারণা, উদাহরণ ও পরিস্থিতিভিত্তিক প্রশ্নের অনুশীলন |
বাংলার জন্য একাধিক সাহিত্য বই লাগবে?
না। একটি মূল বই দিয়ে লেখক-গ্রন্থের কাঠামো তৈরি করুন। এরপর বিগত প্রশ্নে যে অংশে ভুল হচ্ছে, সেই অংশের জন্য অন্য রেফারেন্স দেখুন। বানান, সন্ধি, সমাস ও বাক্যশুদ্ধির মতো নিয়মভিত্তিক বিষয় নিয়মিত অনুশীলন করলে বেশি কাজে আসে।
ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল হলে কী করবেন?
শুধু বিসিএসের MCQ মুখস্থ করবেন না। ইংরেজিতে parts of speech, tense, subject-verb agreement ও preposition; গণিতে শতকরা, অনুপাত, বীজগণিত ও জ্যামিতির ভিত্তি ঠিক করুন। একেকটি অধ্যায়ের সহজ উদাহরণ শেষ করে তারপর বিগত প্রশ্নে যান।
বিগত বছরের প্রশ্নব্যাংক কীভাবে বাছবেন?
ভালো প্রশ্নব্যাংকে পরীক্ষার সাল ও প্রশ্নের উৎস, নির্ভুল উত্তর, ভুল বিকল্প কেন ভুল তার ব্যাখ্যা এবং সংশোধিত সংস্করণ থাকা উচিত। শুধু উত্তর চিহ্নিত বইয়ের চেয়ে ব্যাখ্যাসহ বই নতুনদের বেশি কাজে দেয়। বিগত বিসিএস প্রশ্ন ও সমাধান সংগ্রহের গাইডে প্রশ্ন যাচাইয়ের উপায় রয়েছে।
প্রথমবার প্রশ্ন দেখার সময় নম্বর তুলতে যাবেন না। কোন অধ্যায় থেকে বারবার প্রশ্ন আসে এবং কোন বিষয় আপনি পারেন না, তা চিহ্নিত করুন। দ্বিতীয়বার সময় ধরে পরীক্ষা দিন। ভুল প্রশ্নের জন্য আলাদা নোট রাখুন।
প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার বই কি একই?
পুরোপুরি নয়। প্রিলিমিনারিতে দ্রুত সঠিক উত্তর বাছাইয়ের জন্য ধারণা, তথ্য ও MCQ অনুশীলন দরকার। লিখিত পরীক্ষায় যুক্তি সাজানো, উদাহরণ, তথ্যসূত্র ও নির্ধারিত সময়ে উত্তর লেখার দক্ষতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রিলির একটি সংক্ষিপ্ত গাইড লিখিতের পূর্ণ প্রস্তুতি নয়।
লিখিতের জন্য পিএসসির অফিসিয়াল লিখিত সিলেবাস দেখুন। সাধারণ ও কারিগরি/পেশাগত ক্যাডারের বিষয়গত চাহিদা আলাদা হতে পারে। বিস্তারিত পরিকল্পনার জন্য বিসিএস লিখিত প্রস্তুতির গাইড কাজে লাগবে।
৯০ দিনের বিসিএস পড়ার রুটিন
এই রুটিনটি অনুশীলনের একটি নমুনা, পরীক্ষার অফিসিয়াল সময়সূচি নয়। প্রতিদিন ৩–৪ ঘণ্টা সময় ধরলে নিজের দুর্বলতা অনুযায়ী পরিবর্তন করুন।
| সময় | মূল কাজ | সাপ্তাহিক যাচাই |
|---|---|---|
| ১–৩০ দিন | সিলেবাস ভাগ, বাংলা-ইংরেজি-গণিতের ভিত্তি, প্রতিদিন বিগত প্রশ্ন | দুর্বল অধ্যায়ের তালিকা ও একটি ছোট মডেল টেস্ট |
| ৩১–৬০ দিন | বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক, বিজ্ঞান, ICT ও অন্যান্য বিষয়; দুর্বল অধ্যায়ে অতিরিক্ত সময় | দুটি সময়ভিত্তিক টেস্ট, ভুলের খাতা আপডেট |
| ৬১–৭৫ দিন | সব বিষয়ের প্রথম পূর্ণ রিভিশন, বেশি ভুল হওয়া অংশ পুনরায় পড়া | পূর্ণাঙ্গ মডেল টেস্ট ও সময় ব্যবস্থাপনা |
| ৭৬–৯০ দিন | প্রশ্নব্যাংক পুনরায় অনুশীলন, ছোট নোট, দ্বিতীয় রিভিশন | টেস্টের ভুল বিশ্লেষণ; নতুন বই কেনা বন্ধ |
চাকরি বা ক্লাসের পাশাপাশি পড়লে
সপ্তাহের পাঁচ দিন ৯০ মিনিট করে দুইটি নির্দিষ্ট সেশন রাখুন। একটি সেশনে কঠিন বিষয়, অন্যটিতে MCQ ও রিভিশন। ছুটির দিনে বড় মডেল টেস্ট দিন। সময় কম হলে বিষয় বাদ না দিয়ে সপ্তাহজুড়ে ঘুরিয়ে পড়ুন। আরও বিস্তৃত পরিকল্পনা রয়েছে ৯০ দিনের বিসিএস প্রিলিমিনারি প্রস্তুতি গাইডে।
বই কেনার আগে পাঁচটি বিষয় দেখুন
- সিলেবাস মিল: যে বিসিএসের জন্য পড়ছেন, তার প্রযোজ্য সিলেবাসে বিষয়টি আছে কি না।
- সংস্করণ: সাম্প্রতিক তথ্য, সংশোধনী ও পরীক্ষার পরিবর্তন বইয়ে এসেছে কি না।
- ব্যাখ্যার মান: উত্তর ভুল হলে কারণ বুঝতে পারবেন কি না।
- পাঠযোগ্যতা: ফন্ট, অধ্যায় বিন্যাস, অনুশীলনী ও সূচি সুবিধাজনক কি না।
- ব্যয়: পুরোনো বই, লাইব্রেরি বা ধার করা বই দিয়ে কাজ হলে একই বিষয়ে নতুন সেট কেনার দরকার নেই।
বাজারে Oracle, Professor’s, MP3, Preceptors, George’s, অগ্রদূতসহ নানা প্রকাশনীর বিসিএস বই পাওয়া যায়। এগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক বিকল্প হিসেবে দেখুন, নিশ্চয়তাপূর্ণ সাফল্যের উপায় হিসেবে নয়। বইয়ের দাম ও সংস্করণ পরিবর্তনশীল, তাই নির্দিষ্ট মূল্য এখানে দেওয়া হয়নি।
যে ভুলগুলো প্রস্তুতি পিছিয়ে দেয়
- সিলেবাস না দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় বুকলিস্ট অনুসরণ করা।
- একই বিষয়ে বারবার নতুন বই শুরু করা, কিন্তু আগেরটি রিভিশন না দেওয়া।
- বিগত প্রশ্ন মুখস্থ করা, প্রশ্নের পেছনের ধারণা না বোঝা।
- শুধু সাম্প্রতিক তথ্য পড়া, বাংলা-ইংরেজি-গণিতের ভিত্তি ফেলে রাখা।
- মডেল টেস্টের নম্বর দেখা, কিন্তু ভুলগুলো বিশ্লেষণ না করা।
- পুরোনো গাইডের নম্বর বণ্টনকে নতুন বিসিএসের জন্য চূড়ান্ত ধরে নেওয়া।
বিসিএস প্রস্তুতির বই নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
বিসিএসের জন্য সবচেয়ে ভালো বই কোনটি?
সবার জন্য একটিই সেরা বই নেই। আপনার ভিত্তি, বোঝার সুবিধা ও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার সিলেবাস অনুযায়ী বই বাছুন। একটি ভালো প্রশ্নব্যাংক এবং প্রতিটি দুর্বল বিষয়ের একটি নির্ভরযোগ্য বই দিয়ে শুরু করুন।
কোচিং ছাড়া বিসিএস প্রস্তুতি সম্ভব?
সম্ভব। সিলেবাসভিত্তিক স্বশিক্ষা, নিয়মিত প্রশ্ন অনুশীলন, রিভিশন এবং ভুলের বিশ্লেষণ জরুরি। কোচিং সহায়ক হতে পারে, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।
শুধু একটি ডাইজেস্ট পড়ে কি প্রিলি দেওয়া যাবে?
ডাইজেস্ট সিলেবাসের ধারণা দিতে পারে, তবে দুর্বল ভিত্তি ও ব্যাখ্যাসহ প্রশ্ন অনুশীলনের বিকল্প নয়। বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি ও বিশ্লেষণধর্মী বিষয়ে আলাদা চর্চা দরকার হতে পারে।
বিসিএস প্রস্তুতি কখন শুরু করা ভালো?
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পরীক্ষার নিয়ম বিবেচনায় নিজের সুবিধামতো শুরু করুন। আগে বাংলা-ইংরেজি-গণিতের ভিত্তি শক্ত করলে পরে পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতি সহজ হয়। আবেদনযোগ্যতা দেখতে বিসিএস আবেদনের যোগ্যতা গাইড দেখুন।
পুরোনো সংস্করণের বই কি ব্যবহার করা যাবে?
ব্যাকরণ, মৌলিক গণিত ও স্থায়ী ধারণার জন্য অনেক ক্ষেত্রে যাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য, আইন, পরিসংখ্যান এবং সিলেবাসের পরিবর্তন অবশ্যই নতুন উৎস থেকে মিলিয়ে নিন।
প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়তে হবে?
নির্দিষ্ট ঘণ্টা সবার জন্য সমান কার্যকর নয়। নিয়মিত পড়া, অধ্যায় শেষ করা, ভুল কমানো ও সময়ভিত্তিক টেস্টে উন্নতি হচ্ছে কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শুরু করার কাজ: আজই প্রযোজ্য সিলেবাস সংগ্রহ করুন, একটি বিগত প্রশ্নপত্র সমাধান করে দুর্বল পাঁচটি অধ্যায় লিখুন এবং সেই অধ্যায়গুলোর জন্য প্রয়োজনীয় বই ঠিক করুন। বইয়ের সংখ্যা নয়, শেষ করা অধ্যায় ও নিয়মিত রিভিশনই আপনার প্রস্তুতির অগ্রগতি দেখাবে।


