প্রায় ৬০ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে মাইক্রোসফট। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিষ্ঠানটি ৬০ হাজার মানুষকে ছাঁটাই করছে। নতুন তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোসফটের প্রত্যাশা, প্রস্তাবটি গ্রহণ করবেন ৩ হাজার বা তারও কম কর্মী। বিশাল সংখ্যার কারণে প্রযুক্তি খাতে চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা।
২৬ অক্টোবর ২০২৬ মাইক্রোসফট ‘Voluntary Exit Offer’ বা VEO কর্মসূচি ঘোষণা করে। এরপর ২৮ অক্টোবর প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা অ্যামি হুড কর্মীদের উদ্দেশে এক বার্তায় জানান, খুব কম কর্মীই এই সুযোগ নেবেন বলে তাঁরা মনে করছেন। ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরের এই সিদ্ধান্ত ও কর্মীদের উদ্বেগের বিস্তারিত উঠে এসেছে।
৬০ হাজার কর্মী কি সত্যিই চাকরি হারাচ্ছেন?
না। এখানে ৬০ হাজার হলো প্রস্তাব পাওয়ার যোগ্য কর্মীর আনুমানিক সংখ্যা, চাকরি হারানো মানুষের সংখ্যা নয়। মাইক্রোসফটের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ৩ হাজার বা তার কম কর্মী স্বেচ্ছায় এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারেন বলে তাঁদের ধারণা। এটি পূর্বাভাস; চূড়ান্ত সংখ্যা নয়।
মাইক্রোসফটের ২০২৬ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটিতে পূর্ণকালীন কর্মী ছিলেন প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার। সেই হিসাবে প্রায় ২৭ শতাংশ কর্মী নতুন প্রস্তাবের আওতায় পড়ছেন। কিন্তু যোগ্য হলেই কাউকে চাকরি ছাড়তে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
Voluntary Exit Offer কীভাবে কাজ করবে?
এই কর্মসূচিতে যোগ্য কর্মীরা নিজের সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যেতে পারবেন। বিনিময়ে তাঁদের আর্থিক সহায়তা এবং পরবর্তী চাকরি বা ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে মাইক্রোসফট। প্রস্তাবের বিস্তারিত শর্ত সংশ্লিষ্ট কর্মীদের আলাদা করে জানানো হচ্ছে।
মাইক্রোসফটের ২৬ অক্টোবরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ভারতের নির্দিষ্ট টিমের ৭০ বা তার নিচের লেভেলের কর্মীরা এই সুযোগ পেতে পারেন। সব বিভাগ বা সব কর্মী এই তালিকায় নেই। কোন টিম অংশ নেবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাজ ও প্রয়োজনের ওপর।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যোগ্য কর্মীদের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি সবার জন্য একই নয়; দেশ ও চাকরির অবস্থান অনুযায়ী সুবিধার শর্তে পার্থক্য থাকতে পারে।
কোন কোন বিভাগের কর্মীরা প্রস্তাব পাচ্ছেন?
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে Windows + Devices, Xbox, Copilot, AI Experiences, অর্থ বিভাগ এবং মানবসম্পদ বিভাগের কিছু কর্মীর কথা এসেছে। অন্যদিকে বিক্রয়, বিপণন ও নিরাপত্তার কয়েকটি বিভাগ এই কর্মসূচির বাইরে রয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি বিভাগে কর্মসূচি চালু মানেই ওই বিভাগের সবাই চাকরি ছাড়বেন না। কিছু পদে কেউ চলে গেলে নতুন কর্মী নিয়োগও হতে পারে। ফলে পুরো কর্মসূচিকে সরাসরি ৬০ হাজার পদ বিলুপ্ত করার পরিকল্পনা হিসেবে দেখা ভুল হবে।
এআইয়ের জন্যই কি কর্মী কমাচ্ছে মাইক্রোসফট?
মাইক্রোসফট এআই অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড সেবায় বিপুল বিনিয়োগ করছে। একই সময়ে কর্মীসংখ্যা ও পরিচালন ব্যয় নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দুটি বিষয়কে অনেকে একসঙ্গে দেখছেন। তবে এআই কর্মীদের জায়গা নিচ্ছে বলেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, এমন সরাসরি প্রমাণ নেই। মাইক্রোসফটও কর্মসূচিটিকে পরিবর্তিত ব্যবসায়িক প্রয়োজনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর একটি উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্রকাশিত কোম্পানির আর্থিক ফলাফলে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আয় ১৯ শতাংশ এবং পরিচালন মুনাফা ২১ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন প্রস্তাবটি কোম্পানির আয় কমে যাওয়ার সরল গল্পও নয়। দ্রুত বদলানো ব্যবসা ও বিনিয়োগের অগ্রাধিকারের সঙ্গে কর্মী ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আগেও কি এমন সুযোগ দিয়েছিল মাইক্রোসফট?
চলতি বছরের শুরুতে মাইক্রোসফট দীর্ঘদিনের কিছু কর্মীকে স্বেচ্ছা অবসরের সুযোগ দিয়েছিল। সে সময় যোগ্য কর্মীদের প্রায় ৩০ শতাংশ প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন। নতুন কর্মসূচির শর্ত ও লক্ষ্য আলাদা হওয়ায় এবার অনেক কম মানুষ অংশ নেবেন বলে কোম্পানির ধারণা।
এ ছাড়া জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে আগের সেই বাধ্যতামূলক ছাঁটাই এবং এবারের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার সুযোগ এক ধরনের ঘটনা নয়।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি কর্মীদের জন্য এর অর্থ কী?
নতুন কর্মসূচির ঘোষিত চার দেশের তালিকায় বাংলাদেশ নেই। তাই বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য সরাসরি এই প্রস্তাব চালু হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কীভাবে এআই, সফটওয়্যার ও কর্মীসংখ্যার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে, তা বাংলাদেশের আইটি পেশাজীবী ও চাকরিপ্রার্থীদের জন্যও নজর রাখার মতো বিষয়।
এই ঘটনা থেকে এখনই বলা যায় না যে সফটওয়্যার ডেভেলপার, ডিজাইনার বা অন্য প্রযুক্তি পেশার চাকরি ব্যাপকভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। বরং কাজের ধরন বদলালে নতুন দক্ষতা শেখা, নিজের কাজের ফল দেখাতে পারা এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কেন প্রয়োজন, সেই আলোচনাটি সামনে আসে।
এখন কোন তথ্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
মাইক্রোসফট ৬০ হাজার কর্মীকে চাকরি ছাড়ার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু ৬০ হাজার কর্মীকে বরখাস্ত করেনি। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান প্রত্যাশা সর্বোচ্চ ৩ হাজার কর্মী প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে পারেন। শেষ পর্যন্ত কতজন যাবেন, কোন বিভাগে কী পরিবর্তন হবে এবং নতুন নিয়োগ হবে কি না, তা কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরই পরিষ্কার হবে।


