পৃথিবীর সমুদ্র, নদী ও হ্রদের পানি এল কোথা থেকে? এতদিন এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা ছিল, মহাকাশ থেকে আসা পানিসমৃদ্ধ গ্রহাণু বা ধূমকেতু পৃথিবীতে পানি পৌঁছে দিয়েছে। তবে নতুন একটি গবেষণা বলছে, পৃথিবী গঠনের সময়ই তার চারপাশের হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল এবং পাথরের কণার রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোর গবেষকদের এই গবেষণা Nature Geoscience সাময়িকীতে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে। ২৬ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণার ফল নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষণাটি পৃথিবীর সব পানি কোথা থেকে এসেছে, তার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; বরং পানির উৎপত্তি সম্পর্কে একটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার পরীক্ষামূলক প্রমাণ।
পৃথিবীর পানির উৎস নিয়ে এতদিন কী ধারণা ছিল?
পৃথিবী গঠিত হয়েছিল প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে। শুরুর দিকে গ্রহটির পরিবেশ ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। তাই পানি ধরে রাখা এবং এত বিপুল পরিমাণ পানি পৃথিবীতে কীভাবে এল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের আলোচনা রয়েছে। একটি পরিচিত ধারণা হলো, সৌরজগতের অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা অঞ্চল থেকে আসা পানিসমৃদ্ধ গ্রহাণু, উল্কাপিণ্ড বা অন্য উপাদান পরবর্তী সময়ে পৃথিবীতে পানি সরবরাহ করেছে।
কিন্তু সেই উপাদান কত দূর থেকে কীভাবে এসেছে এবং পৃথিবীর বর্তমান রাসায়নিক গঠনের সঙ্গে সেই ব্যাখ্যা কতটা মেলে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। নতুন গবেষণা সেই আলোচনায় আরেকটি সম্ভাবনা যোগ করেছে।
নতুন গবেষণা বলছে, পাথর আর হাইড্রোজেন থেকেই পানি তৈরি হতে পারে
গ্রহ তৈরির সময় ধুলা ও ছোট পাথুরে কণা একত্র হতে হতে বড় বস্তু তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে বলেন পেবল অ্যাক্রিশন (Pebble Accretion)। গবেষকদের ধারণা, পৃথিবী বড় হওয়ার এক পর্যায়ে তার চারপাশে উত্তপ্ত, হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল তৈরি হয়েছিল।
ওই বায়ুমণ্ডল দিয়ে নিচে নামার সময় সিলিকেট পাথরের কণাগুলো গরম হয়ে গলে যেতে পারে। তখন পাথরে থাকা আয়রন অক্সাইডের সঙ্গে হাইড্রোজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ধাতব লোহা ও জলীয় বাষ্প তৈরি হয়। উৎপন্ন লোহা পরবর্তী সময়ে গ্রহের ধাতব কেন্দ্র গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।
পরীক্ষাগারে কীভাবে বিষয়টি যাচাই করেছেন বিজ্ঞানীরা?
গবেষণায় সিলিকেট পাথরের নমুনা ১,২০০ থেকে ১,৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হাইড্রোজেন গ্যাসের প্রবাহে উত্তপ্ত করা হয়। তুলনার জন্য হিলিয়াম গ্যাসের প্রবাহেও একই ধরনের পরীক্ষা চালানো হয়। পরীক্ষাগুলো চলে ১৫ মিনিট থেকে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত।
হাইড্রোজেনের উপস্থিতিতে নমুনার প্রায় ৮০ শতাংশ আয়রন অক্সাইড ধাতব লোহায় রূপান্তরিত হয় এবং একই প্রক্রিয়ায় জলীয় বাষ্প তৈরি হয়। হিলিয়ামের পরীক্ষায় একই প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। গবেষকদের মতে, এ ফলাফল দেখায়, উত্তপ্ত হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ পরিবেশ পানি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষক জ্যাকারি শার্প জানিয়েছেন, পরীক্ষার ফল বড় পরিসরে হিসাব করলে বহু মহাসাগরের সমপরিমাণ পানি তৈরির সম্ভাবনা দেখা যায়। তবে এটি গবেষণাভিত্তিক হিসাব ও সম্ভাবনা, পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসে ঠিক এত পানি তৈরি হয়েছিল এমন সরাসরি পরিমাপ নয়।
তাহলে কি ধূমকেতু বা গ্রহাণু পৃথিবীতে পানি আনেনি?
না, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। নতুন গবেষণায় দেখানো হয়েছে, পৃথিবীর নিজস্ব গঠনপ্রক্রিয়ায় পানি তৈরি হওয়ার একটি সম্ভাব্য রাস্তা আছে। কিন্তু বর্তমান সমুদ্রের পানির কত অংশ এই প্রক্রিয়ায় এসেছে, আর কত অংশ বাইরের উৎস থেকে পৌঁছেছে, তা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন। একাধিক উৎস একসঙ্গে কাজ করে থাকাও সম্ভব।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষাগারে পানি তৈরি করা গেছে মানে পৃথিবীর সব পানির উৎপত্তি নিশ্চিতভাবে জানা গেছে, এমন নয়।
অন্য গ্রহে প্রাণের সম্ভাবনার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?
গবেষণাটি শুধু পৃথিবীর ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্য কোনো পাথুরে গ্রহও যদি গঠনের সময় অনুরূপ হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল ও পাথুরে কণা পেয়ে থাকে, সেখানেও পানি তৈরির রাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটতে পারে। ফলে পৃথিবীর বাইরে গ্রহগুলো কীভাবে পানি পায়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে কোনো গ্রহে পানি তৈরির সম্ভাবনা থাকলেই সেখানে প্রাণ আছে বা প্রাণ জন্মাবে, তা বলা যায় না। গ্রহের তাপমাত্রা, পরিবেশ, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং আরও অনেক শর্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার গুরুত্ব কোথায়?
পৃথিবীর পানির উৎস খুঁজতে এতদিন মহাকাশ থেকে পানি আসার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই গবেষণা দেখিয়েছে, গ্রহ তৈরির প্রক্রিয়াই পানির একটি বড় উৎস হতে পারে। ফলে পৃথিবীর প্রাচীন পরিবেশ এবং দূরের পাথুরে গ্রহের বাসযোগ্যতার ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গবেষণাটি নতুন একটি পরীক্ষামূলক ভিত্তি যোগ করেছে।
মহাকাশ ও প্রযুক্তি নিয়ে আরও সহজ ব্যাখ্যা পড়তে BanglaGeek-এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী বিষয়ক গাইড এবং ChatGPT কীভাবে কাজ করে নিবন্ধও দেখতে পারেন।


